শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। বাংলাদেশকে স্বাধীন করার পর, বিধ্বস্ত অবকাঠামো ও অর্থনীতি নিয়ে, বাঙালি জাতির উন্নতির জন্য আধুনিক শিক্ষা চালু করাই ছিল তখন অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
কিন্তু বঙ্গবন্ধু জানতেন, ঘরে ঘরে আধুনিক শিক্ষা পৌঁছে দিতে না পারলে এই স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে। তাই দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আদর্শ মানবসম্পদ গড়ে তোলাই ছিল বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা দর্শনের মূল বিষয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার এবং ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার শিক্ষার জন্যই সমান সুযোগ থাকা আবশ্যক।
বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন বক্তব্য, নীতি ও কর্মকাণ্ডের মধ্যে শিক্ষা বিষয়ে তার চিন্তাধারা প্রতিফলিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিভিন্ন তথ্য, দলিল ও প্রকাশনার পর্যালোচনা করে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা বিষয়ক চিন্তা ও দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ তার দুটি বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়; একটি বক্তব্য তিনি দেন ১৯৭২ সালের মার্চে চট্টগ্রামে এবং অন্য বক্তব্যটি দেন ১৯৭৩ সালের মার্চে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট)।
১৯৭২ সালে ড. কুদরাত-ই-খোদাকে প্রধান করে বঙ্গবন্ধু একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেন, যার প্রধান কাজ ছিল চলমান শিক্ষাব্যবস্থাকে মূল্যায়ন করা এবং সত্যিকারের সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য যথাযথ শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলনের ব্যাপারে সুপারিশ করা। শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য শাসনামলের শুরু থেকেই বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর সরকার। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাবিষয়ক চিন্তার সারমর্মটাই এখানে সংক্ষেপে তুলে ধরছি।
স্বাধীনতার পর, পাকিস্তান থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে হতাশ ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭২ সালের ৩০ মার্চ, চট্টগ্রামে শিক্ষকও লেখকদের এক সমাবেশে বক্তব্য রাখার সময় অনুশোচনা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এই শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিকশিত মানুষ সৃষ্টির পরিবর্তে এটি শুধু আমলা তৈরি করছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে না পারলে সমাজ থেকে দারিদ্র্য এবং বৈষম্য দূর করা যাবে না এবং সমাজতন্ত্র বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। গ্রামীণ মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রত্যেক শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের কিছু দিন করে গ্রামাঞ্চলে কাটানোর পরামর্শ দেন তিনি। বঙ্গবন্ধু আভাস দেন, দেশের টেকসই আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে শিক্ষাবিদদের নিয়ে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে, যা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবে। তিনি বলেন, পূর্বের সকল শিক্ষা কমিশন বাঙালিদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
১৯৭৩ সালের ২০ মার্চ, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-এর প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় শিক্ষা সম্পর্কে তার চিন্তাধারা আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন বঙ্গবন্ধু। সেদিনের অনুষ্ঠানে নতুন স্নাতক সনদধারী এবং শিক্ষকদের সামনে বঙ্গবন্ধু বলেন,- ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের দুইশ' বছরের ও পাকিস্তানের ২৫ বছরে গড়ে ওঠা শিক্ষাব্যবস্থা শুধু কেরানি তৈরি করেছে, মানুষ তৈরি করেনি। এজন্য তিনি এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন, যার মাধ্যমে আদর্শ নাগরিক গড়ে তোলা যাবে এবং যার মাধ্যমে স্বপ্নের সোনার বাংলা নির্মাণে সহায়তা করবে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং সমাজতন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বঙ্গবন্ধু।
তিনি বৈদেশিক নির্ভরশীলতার বিরুদ্ধে সবাইকে সতর্ক করে দেন এবং এটিকে টেকসই আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেন। বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর জন্য প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন কাজ করছে এবং আশা করেন যে, এই কমিশন একটা শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ এমন একটি প্রতিবেদন জমা দেবে- যা জাতিকে সমৃদ্ধি ও মুক্তির দিকে নিয়ে যাবে।
total views : 184