আমাদের এ যুগটার বহু অভিধা। পারমাণবিক যুগ, ইলেকট্রনিক্সের যুগ, মহাকাশ অভিযানের যুগ ইত্যাদি কত কিছু। তার মধ্যে সর্বগ্রাসী যে অভিধাটি সবার আগে পাওয়া হয়েছে সেটা হলো, এজ অব রিজন অর্থাৎ যুক্তির যুগ। যুক্তির মাধ্যমেই এসেছে বিজ্ঞানের অগ্রগতি- তার সমস্ত শাখা-প্রশাখা নিয়ে। যুক্তির জয় দেখেছে মানুষ। যুক্তিতে যা টিকে এ যুগে তাই তার কাছে গ্রহণযোগ্য। অন্যথা নয়।
সমাজে নারীর স্থান নিয়েও এক সময়ে তর্ক উঠেছিল মানুষের মধ্যে। গর্ভধারণ ও সন্তান মানুষ করা ব্যতীত তার অন্য কোনো কর্তব্য আছে কি না তা নিয়ে বিস্তর তর্কবিতর্ক করেছে গ্রিক দার্শনিকরা। অবশেষে প্লেটো এই বলে সে বিতর্ক উপসংহার টানেন রাষ্ট্রের ঐক্য ও শক্তির স্বার্থে পুরুষের সঙ্গে মেয়েরাও সমান ও একাই দায়িত্ব বহন করবে। তিনি বলেন, পুরুষের ন্যায় মেয়েদের জন্যও একই প্রতিপালন ও শিকার ব্যবস্থা আমাদের করতে হবে। তার এই যুক্তি পরবর্তী কোনো সভ্যতার আমলে কোনো সমাজ কর্তৃক অগ্রাহ্য হয়নি। এমনকি আরবে ইসলামি সভ্যতার যুগেও। আমাদের দেশেও ঊনবিংশ শতাব্দীর রেনেসাঁর যুগ থেকে শুরু করে নারীর ভ‚মিকা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয়েছে। তাদের সমতালিক প্রতিপালন ও শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃতি পেয়েছে। তাই একালে এসে নারী শিক্ষার ব্যাপার নিয়ে আবার কলমবাজি করতে হবে কোনোদিন ভাবিনি। পাঠকরাও হয়তো বিস্মিত হবেন একটি পুরনো স্থিরিকৃত বিষয় নিয়ে পুনঃচর্চার প্রয়াস দেখে কিন্তু তা না করে পারলাম না ছোটখাটো কিছু ঘটনা প্রত্যক্ষ করে, যা জানিয়ে দিল যে নারী শিক্ষা সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণাসমূহ এবং তার প্রতি ঔদাসীন্যের ভাব এখনো নির্মূল হয়ে যায়নি সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে। দরিদ্র নিম্নবিত্তের স্তর থেকে তো বটেই, সচ্ছল মধ্যবিত্তের স্তর থেকেও।
সেদিন জনৈক বন্ধুর গৃহে দাওয়াত রক্ষা করতে গিয়ে আলাপ প্রসঙ্গে জানতে পারলাম তার কনিষ্ঠা কন্যাটির পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মেয়েটি মহিলা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছিল। লেখাপড়ায় মন্দ ছিল না। আগ্রহীও ছিল। তারপরও মাঝপথে ছেদ পড়ে গেল শিক্ষায়। আজকাল পথে-ঘাটে কোথাও কোথাও চরিত্রহীন বখাটে ছেলেদের উৎপাতের কথা শোনা যায়। যার ফলে মেয়েদের স্কুল-কলেজে গমনাগমনে বিঘ্ন ঘটছে। বন্ধুটির এ মেয়ে নিজেদের গাড়িতেই কলেজে যাওয়া-আসা করত। কাজেই বখাটেদের উৎপাতের প্রশ্ন ওঠে না তার ক্ষেত্রে। অভিভাবকের আর্থিক দুর্বলতা থাকলে ছেলে ও মেয়ের মধ্যে কারো পড়া বন্ধ করে খরচ কমাবার প্রয়োজন দেখা গেলে মেধা, আগ্রহ ও পরীক্ষার ফলাফল কোনোটাই বিচার না করে সোজা মেয়ের শিক্ষায় ইতি ঘটিয়ে দেয়া হয়। বিয়ের প্রস্তাব এলে তো অবশ্যই ঘরে ফিরতেই হবে মেয়েকে যে ক্লাস থেকেই হোক না কেন। হোক না ফাইনাল, পরীক্ষার আর কয়েকটা সপ্তাহ মাত্র বাকি। বালিকা স্কুল প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী ব্যক্তিদের মুখে অভিযোগ শুনি, মেয়েরা অষ্টম-নবম শ্রেণিতে উঠলেই বিশেষ করে পল্লী এলাকায় তাদের পড়াশোনার ইতি টানতে হয়। অভিভাবকদের হাতে-পায়ে ধরেও এসএসসিটা সমাধা করিয়ে দেয়া যায় না। উপরের ক্লাসে মেয়ের সংখ্যা গুরুতরভাবে কমে যায় বলে স্কুল চালানোই দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। তাদের মতে, মেয়েদের বিয়ের বয়সের ব্যাপারে গ্রামেগঞ্জে সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান কড়াকড়িভাবে প্রয়োগ হওয়া দরকার। সমাজের বৃহত্তর অংশে নারীশিক্ষা এখনো প্রয়োজন হিসেবে নয় বরং বাধ্যবাধকতা হিসেবেই বিবেচিত। সুযোগ পেলেই অভিভাবকরা কাঁধ থেকে নামিয়ে দেয় সেই বাধ্যবাধ্যকতার জোঁয়ালটি। আমার এই বন্ধুটির কন্যার পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়ার কারণ সেরূপ কিছু নয়। মেয়ের মা মনে করে মেয়ে এত বেশি লেখাপড়া দিয়ে করবে কী, ব্যস। সেজন্যই মধ্যপথে চুকিয়ে দিতে হলো তাকে শিক্ষার পাঠ।
total views : 194